শেখ মুজিবের উচ্চতায় কেবল শেখ মুজিবই:
মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভূঁইয়া এমপি
১৫ আগস্ট বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে এক কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এদিনে বিপথগামী একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে শহীদ হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আবার রক্ত ঝরেছে আমাদের স্বজনের। যে হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালীর রক্তার্জিত বিজয়ের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ’৭৫ সালের এই দিনে ঘাতকরা একটি বড় আঘাত করলো। যে আঘাত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যবোধকে হত্যা করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যার তিন মাসের মাথায় ৩ নভেম্বর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হলো বন্দী অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এই দু’টি নিষ্ঠুর ও বর্বর হত্যাকান্ডের ঘাতকরা এক এবং অভিন্ন।
আমার জানামতে, সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া পৃথিবীর কোনও দেশ স্বাধীন হয়েছে এমন নজির ইতিহাসে বিরল। স্বাধীন বাংলাদেশও কোন আকস্মিকতার ফসল নয়। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ আর সংগ্রামের পরিণতি আমাদের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর এর অগ্রভাগে নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। ১৯৭১ সালে আমাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল বঙ্গবন্ধুর সুবিশাল নেতৃত্ব। সেইদিন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতে সেনাবাহিনীর একজন তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে পাকিস্তান সরকারের সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অস্ত্র তাক করি পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে। এখানেও আমার চেতনায় কাজ করছিল শেখ মুজিবের আদর্শ ও তার দৃঢ় অবিচল ব্যক্তিত্ব।
আজ দুঃখ হয়, এখনও মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পরও স্বাধীনতার ঘোষক এবং ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক দেখে। একটি মীমাংসিত বিষয়কে নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে ইতিহাসের গতিকে উল্টোপথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে দীর্ঘ দিন ধরে। তবে ইতিহাস যে সত্যকে পাশ কাটিয়ে চলতে পারে না এই সত্যও আজ প্রমাণিত। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য কোন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাকেই একটি ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। সত্যি করে বলতে কি, যুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি বাঙালীর অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এবং সেটা বঙ্গবন্ধুর আহবানে। এখানে একটা কথা বলতে হয়Ñ আমার নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম লড়াই (কুমিরার লড়াই) হয়েছিল ২৬ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যায়। সেই যুদ্ধে একজন কর্নেলসহ বিভিন্ন পদের ১৫২ জন পাকিস্তানি সৈন্য মারা যায়। কুমিরার যুদ্ধে অংশ নিতে তো আমি বা আমার সহযোদ্ধারা কোন ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলাম না। আসলে বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা ছিল ২৩ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম। আর চূড়ান্ত সিগন্যাল ছিল ৭ মার্চ ১৯৭১, যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আজ বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ বা তার পাশে অবস্থানের চেষ্টা করা যেমন বোকামি, তেমনি যারা অন্য কাউকে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ করাতে চাচ্ছে সেটাও তাদের মূর্খতা। শেখ মুজিবের উচ্চতায় কেবল শেখ মুজিবকেই মানায়। অন্য কাউকে নয়। একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয়, গায়ের জোরে এবং অর্থের মানদন্ডে কখনও নেতা হওয়া যায় না। যার নেতৃত্ব জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তিনি নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে যান। বঙ্গবন্ধুর মাঝে সেসব গুণ ছিলÑ তাইতো তিনি শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়েছেন।
আজ ৪২ বছর পূর্ণ হলো বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। এরা হলো কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), মেজর (অব.) এ কে বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিনকে (আর্টিলারি)। পলাতক অবস্থায় খুনীদের একজন আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুইয়েতে মারা গেছে। উল্লেখ্য, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ছয় খুনি এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এরা হলো লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) নূর চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান। নিজেদের রক্ষা করতে বার বার এরা বিভিন্ন দেশ বদল করছে। লে. কর্নেল রশিদ অবস্থান করেন লিবিয়ার বেনগাজি শহর ও পাকিস্তানে। মেজর ডালিমের ব্যবসাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে কেনিয়া, লিবিয়া ও পাকিস্তানে আসা-যাওয়া করে। ক্যাপ্টেন মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম বর্তমানে পাকিস্তান ও লিবিয়ায় রয়েছে। লে. কর্নেল রাশেদ যুক্তরাষ্ট্রে এবং মেজর নূর চৌধুরী পালিয়ে আছে কানাডায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সব উদ্যেগের কথা বলা হলেও বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনীদের রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই দাবিতে এবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা, সেমিনার, মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক ঘটনা। একটা কালো অধ্যায়। এখনও মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত পলাতক ছয় খুনীর রায় কার্যকর বাকি। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের তেমন কোন তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায় না। কেবল আগস্ট মাস এলেই যেন বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় দেখা দেয়। আইনমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের জন্য সরকার কাজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, খুনীরা কে কোন দেশে অবস্থান করছে তা চিহ্নিত করা গেছে। খুনীদের ফিরিয়ে আনার তৎপরতা চলছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে পলাতক খুনীদের ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। নিয়মানুযায়ী, কোন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ১০ বছর অতিক্রান্ত হলে তা নতুন করে নবায়ন করতে হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে নবায়ন প্রক্রিয়া আপডেট করেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে আবার নতুন করে নবায়ন করা হয়। এর আগে বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বন্দী বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে ব্যাঙ্কক থেকে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে মহিউদ্দিন আহমেদকে (ল্যান্সার) দেশে ফেরত আনা হয়। প্রশ্ন হলোÑ কয়েকজনের অবস্থান নিশ্চিত হবার পরও কেন তাদের দেশে ফেরত আনা যাচ্ছে না? কেন দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর বন্দী বিনিময় চুক্তি হচ্ছে না?
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ খোদ সরকারের ভেতরেও এখনও খুনীদের সহায়তাকারীরা ঘাপটি মেরে আছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়। ফলে কাউকে ধরার ব্যাপারে কোন তৎপরতা শুরু হলেও এক পর্যায়ে তা থেমে যায়। একথা সত্য যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার মোটিভ এখনও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজা হয়নি। কেবল হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত ও বিচার করা হয়েছে। হত্যার নেপথ্যের মূল নায়কদের আজ পর্যন্ত চিহ্নিত করা যায়নি। এমন কি খুনীদের পুনর্বাসনকারীদের চিহ্নিত করা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যে কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের বহু অজানা ঘটনা গত ৪২ বছরেও প্রকাশ হয়নি। এখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল সরকারে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী, আমরা চাই পলাতক খুনিদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
পরিশেষে বলবো, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট প্রকৃত অর্থে কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল বিদেশী অপশক্তির ষড়যন্ত্র ও দেশীয় কিছু দালালের উচ্চাভিলাসের কলঙ্কিত অধ্যায়। এ কথা আজ দিবালোকের মতো সত্য যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার পরিপূর্ণভাবে না করা গেলে এ দেশ থেকে হত্যার রাজনীতি শেষ হবে না। কারণ, হত্যার রাজনীতির চর্চা এখন গ্রেনেড, জঙ্গীদের নৃশংসতায় পৌঁছেছে। দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পলাতক খুনিদের রায় কার্যকর এবং অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকান্ডগুলোর বিচার দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
লেখক: মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভূঁইয়া, সভাপতি- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি।