১৫ আগস্টঃ ইতিহাসের কলঙ্কময় দিন

0 507

।। মেজর মোহাম্মদ আলী সুমন (অব.) ।।

আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনেই ঘটেছিল জাতির ইতিহাসের কলঙ্কময় ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই দিন কাকডাকা ভোরে বিপথগামী কিছু সেনা সদস্য সপরিবারে হত্যা করে। বাঙালি জাতির ললাটে এঁটে দেয় কলঙ্কের তিলক। ইতিহাসের নৃশংসতম ও গভীর মর্মস্পর্শী সেই হত্যাকাণ্ডের আজ ৪২তম বার্ষিকী।

রক্তঝরা এই দিনটিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কিছু বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিকের চক্রান্ত এবং সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজনসহ নৃশংসভাবে নিহত হন ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে। রাজনীতির সঙ্গে সামান্য সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও নারী এবং শিশুদেরও সেদিন হত্যা করেছে ঘাতকেরা। ১৯৭৫ সালের কলঙ্কময় ১৫আগস্টে আবহমান বাংলা ও বাঙালির আরাধ্য পুরুষ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও ঘাতকের বুলেটে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব; বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল সহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত,বঙ্গবন্ধুর ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল আহমেদ সহ কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী। নিহত হন পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। দেশের বাইরে থাকায় ঘাতক চক্রের হাত থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বঙ্গবন্ধু যখন বন্দী অবস্থায় পাকিস্তানে ছিলেন তখন তাঁকে ফাঁসি দিতে পারেনি। কিন্তু ইয়াহিয়ার ফাঁসির আদেশ ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট যে ঘাতকচক্র বাস্তবায়ন করলো তারা আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করে না। স্বার্থান্বেষী মহল যারা বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের বদলে পুরস্কৃত করেছে, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে,যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছে তারাই এ দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের শিকড়। দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতাই সৃষ্টি করতে হবে – যারা যুদ্ধাপরাধী এবং যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাজাপ্রাপ্তদের মন্ত্রী বানিয়েছে তাদের বিচার হতে হবে। সেভাবেই আমাদের জনমত সৃষ্টি করতে হবে। আর সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে। যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের মদদ দিতে পারে, পুরস্কৃত করতে পারে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের জাতীয় পতাকা দিয়ে মন্ত্রী বানাতে পারে, যারা খুনীদের ভোট চুরি করে সংসদে বসিয়ে বিরোধীদলের নেতা বানাতে পারে, তারা সব ধরনের সন্ত্রাসের সাথে জড়িত, তারাই জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত- এদেরও বিচার ইনশাল্লাহ জনগণ করবে।

সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা ছিল বিচারের আওতাবহির্ভূত। দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা সচল হয়। তিন প্রধান আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ মামলার বিচারকাজ শেষে আদালত ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। এর মধ্যে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ আসামির মৃতুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এঁরা হলেন সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), সাবেক মেজর বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ার রশিদ খান এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার)। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও দণ্ডিত ১২ খুনির মধ্যে সাতজন পলাতক। তাঁদের মধ্যে একজন জিম্বাবুয়েতে মারা যান। বাকি ছয়জনের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অবস্থান করছেন। দুই থেকে তিনজনের অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে শতভাগ নিশ্চিত তথ্য নেই।

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় অবিলম্বে কার্যকর করার মাধ্যমেই জাতির কলঙ্কময় ১৫ আগস্টের শাপমোচন করতে হবে। জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমেও জাতির কলঙ্কময় ১৫ আগস্টের শাপমোচন করতে হবে।

লেখকঃ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.