অনলাইনেই তৈরি আয়কর রিটার্ন ফরম

0 17

 

||নিজস্ব প্রতিনিধি||

চাকরিজীবীদের জন্য আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত এবং দাখিল করাটা বেশ কষ্টকরই বলা চলে।  এর জন্য সাধারণত অভিজ্ঞ কোনো উকিলের শরণাপন্ন হতে হয়। যা অনেকের কাছেই সময় এবং ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর এই জটিল কাজটির অনলাইন সমাধান করতে মাঠে নেমেছে  ‘বিডিট্যাক্স’।

ছবি:BDTEX এর সিও জুলফিকার আলী ও তার টিম।

‘বিডিট্যাক্স.কম.বিডি’ (bdtax.com.bd) অনলাইন ট্যাক্স সফটওয়্যার। তাদের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে যে কেউ খুব সহজে এবং তুলনামূলক অল্প খরচে এখন ট্যাক্স রিটার্ন ফর্ম তৈরি করতে পারবেন। আর এই সুবিধা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তারাই দিয়ে যাচ্ছে।
শুরুর কথা
এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবেন জুলফিকার আলী। তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যনির্বাহী পরিচালক। ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয় পরিকল্পনা। এরপর ছয় মাস বাজার বিশ্লেষণ করে ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে শুরু হয় বিডিট্যাক্সের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৪ জনের একটি দল। সাইটটির বর্তমান নিবন্ধনকৃত গ্রাহক রয়েছেন ৪০ হাজার আর প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ শতাধিক। গ্রাহকের ৮০ শতাংশই সক্রিয়। এ ছাড়া করদাতাদের তথ্য বিশ্লেষণ করার জন্য কে এম হাসান এবং এম এল চৌধুরী নামে দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তিবদ্ধ বিডিট্যাক্স।


সুবিধা উভয় পক্ষেরই
ট্যাক্স রিটার্নের এই অনলাইন সমাধানে উপকৃত হবে সরকার এবং করদাতা উভয়েই। কেননা দেখা যায়, বেশির ভাগ মানুষই কর দিতে পারেন না মূলত ট্যাক্স রিটার্ন প্রস্তুত এবং দাখিলে জটিলতার কারণে। এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ই-টিনধারীদের প্রায় চার শতাংশের মাত্র এক শতাংশ ব্যক্তিই নিয়মিত কর প্রদান করছেন। বাকি তিন শতাংশ ব্যক্তি যে ইচ্ছা করেই কর ফাঁকি দিচ্ছেন তা কিন্তু নয়; বরং এর বেশির ভাগ ব্যক্তিই জটিলতার কারণে নিয়মিত কর প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছেন। এঁদের করের আওতায় আনতে পারলে জাতীয় রাজস্ব অনেকটাই বাড়বে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
করদাতাদের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে অনলাইন পদ্ধতি নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক। অনলাইনে একবার নিবন্ধিত হয়ে গেলেই নির্দিষ্ট ফি দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটেই করদাতা নিজের রিটার্ন ফর্ম তৈরি করে নিতে পারবেন। বিডিট্যাক্সের জ্যেষ্ঠ প্রকল্প ব্যবস্থাপক এনায়েত খন্দকার বলেন, ‘আমাদের সাইটের মাধ্যমে তৈরি করা রিটার্ন ফর্মটি যথেষ্টই নির্ভরযোগ্য, কেননা করদাতাদের দেওয়া তথ্যগুলো আমরা অভিজ্ঞ দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই করে নিই।’
এ ছাড়া করদাতাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য রয়েছে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কাস্টমার সার্ভিস টিম, যাঁরা অফিস সময়ের ভেতরে ফোনে বা অনলাইনে গ্রাহকদের তথ্যসেবা দিয়ে থাকেন। আবার পিক সিজনে অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বরে আরো তিনজন এই দলে যুক্ত হয়ে রাত ২টা পর্যন্তও সেবা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে সাইটটিতে ব্লগও রয়েছে। কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিতই লেখা প্রকাশিত হয় সেখানে।

যেভাবে কাজ করে
এ বিষয়ে এনায়েত খন্দকার বলেন, ‘আমাদের সাইটে ফর্ম তৈরি করাটা খুবই সহজ। এ জন্য করের বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে না ব্যবহারকারীকে। এই সাইটে প্রথমে নিবন্ধন করে নিতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে ব্যবহারকারীর কাছে বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সঠিকভাবে পূরণ করতে পারলেই ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট ফর্মটি তৈরি হয়ে যাবে। এরপর অনলাইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করলে তিনি সেই ফর্মটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। পরের বছর ফর্ম তৈরি করার সময় আগের তথ্যগুলো কপি করে নেওয়া যাবে, এরপর শুধু প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে অল্প সময়ের মধ্যে আবার নতুন একটি ফর্ম তৈরি করা যাবে। খরচ ব্যক্তিপ্রতি ৩৯৯ টাকা (ডিলাক্স) ৭৯৯ টাকা (প্রিমিয়ার)। প্রতিষ্ঠানের জন্য খরচ ভাগ করা হয়েছে চারভাবে। সেসবের খরচগুলো হচ্ছে এমন—১৩৯৫০ টাকা, ২৩৯৫০ টাকা, ৩৯৯৫০ টাকা এবং ৪৭৯৫০ টাকা। বিস্তারিত জানা যাবে এদের ওয়েবসাইটে।

তথ্যের নিরাপত্তা
অনলাইনে তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তার ওপর সেই তথ্য যদি হয় অর্থসংক্রান্ত, তাহলে সেটির গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। বিডিট্যাক্স যেহেতু করদাতাদের আয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করে, সুতরাং এসব তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণের বিষয়ে তাদের যথেষ্টই মনোযোগ দিতে হয়। এনায়েত খন্দকার জানান, নিরাপত্তার বিষয়ে তাঁরা দুটি ধাপে কাজ করেন। এসবের একটি ক্লাউড সার্ভার আরেকটি অ্যাপ্লিকেশন। গ্রাহকদের সব তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁরা অ্যামাজনের ওয়েব সার্ভিস ব্যবহার করেন। সংবেদনশীল তথ্যগুলো ট্রিপল লেভেল এনক্রিপশনের মাধ্যমে এনক্রিপ্টেড আকারে রাখা থাকে। তাঁদের সাইটে অননুমোদিত প্রবেশ থেকে রক্ষার জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন সাইটলক। এ ছাড়া রয়েছে মাল্টিডোমেইন এসএসএল সার্টিফিকেট, ইমপ্লিমেন্টেড আইসোলেটেড নেটওয়ার্ক (ভিপিসি) এবং ডাটাবেইস নিরাপত্তার জন্য ফায়ারওয়াল। শুধু তা-ই নয় গ্রাহকদের লগইনে যদি পর পর তিনবার পাসওয়ার্ড ভুল হয়, তাহলে তার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে কখনো কখনো কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়ে সেটাকে পুনরুদ্ধার করতে হয়। শুধু হ্যাকারদের থেকেই নয়, নিজেদের ভেতর থেকে যেন কোনো তথ্য চুরি না হয় সে ব্যাপারেও সচেতন বিডিট্যাক্স। গ্রাহকদের ডাটা অ্যাকসেসের অনুমোদন শুধু তাদের অফিস আইপিকেই দেওয়া আছে। অর্থাৎ অফিসের বাইরে অন্য কোনো জায়গা থেকে এই ডাটাবেইসে ঢোকা যাবে না।

অর্জন
খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিডিট্যাক্স পেয়েছে দুটি পুরস্কার। ২০১৭ সালে তারা পেয়েছে আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং গ্রামীণফোন আয়োজিত বাংলাদেশ স্টার্টআপ অ্যাওয়ার্ড। সে বছরই তাদের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ হাজারে। এরপর ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি বেসিসের ‘ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড’ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া একই বছর প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অ্যাপিকটা অ্যাওয়ার্ডের জন্যও নির্বাচিত হয়। তখন তাদের গ্রাহক বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শুধু গ্রাহকদের ট্যাক্স রিটার্ন ফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না ট্যাক্সবিডি। কর প্রদানের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে চায় এই প্রতিষ্ঠান। গ্রাহক যেন ঘরে বসেই সম্পূর্ণ কর প্রদানের কাজটি সেরে ফেলতে পারেন, সেটি বাস্তবায়নের জন্য রয়েছে সময় অনুসারে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পরিকল্পনা। যেমন আগামী বছরের ভেতর ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপও চালু করবে প্রতিষ্ঠানটি। একই বছর তারা ই-চালানের মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে তাদের পেমেন্ট গেটওয়েকে যুক্ত করাতে হবে। এটি বেশ জটিল একটি কাজ। বিভিন্ন ধরনের জটিলতা, আইন এবং করসংক্রান্ত হিসাব-নিকাশের বিষয় আছে এতে। তবে এনায়েত খন্দকার বলেন, ‘রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বিডিট্যাক্সের এই পরিকল্পনাকে যথেষ্ট সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি। রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমরা বেশ আশাবাদী। এটি হওয়ার পর আমাদের প্রতিষ্ঠান একটি পূর্ণাঙ্গ সেবার ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। তখন করসংক্রান্ত যাবতীয় পেপার ওয়ার্কগুলোও নিজ দায়িত্বে আমরাই করে দেব। এমনকি আপডেটেড কাগজপত্র গ্রাহকের ঠিকানাতেও পৌঁছে দিবো, যদিও এ জন্য আলাদা ফি নেওয়া হবে। এ বছর আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকসংখ্যা এক লাখে উন্নীত করার।’
ট্যাক্সবিডি আশা করছে, পূর্ণাঙ্গ সেবাটি যখন গ্রাহকদের দিতে পারবে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের প্রচার অনেক বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশে করদাতাদের একটি বড় অংশই এই সেবার আওতায় আসবে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যা পাঁচ লাখে নিয়ে যাওয়ার।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.