কৃষক পরিবারের মেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার এক কৃষক পরিবারের বড় মেয়ে ফারজানা আক্তার ববি। কৃষক বাবা সুলতান আহম্মদের কষ্ট বুঝে সফলতা অর্জন করেন বাবার বড় মেয়ে ববি। বাবার দু:খ কষ্টকে মেনে নিয়ে চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা। পড়াশোনার খরচ মেটাতে বাবা সুলতান আহম্মদের মাঝে মাঝ হিমশিম খেতে হয়েছে। তবুও যেন অর্থের কাছে পরাজিত হননি তিনি। ৩৫ তম বিসিএস (প্রশাসন) চান্স পাওয়া ববিকেও অভাব দমাতে পারেনি। শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন ফারজানা আক্তার ববি। পাড়াগাঁয়ের সেই কৃষক পরিবারের মেয়ে ববি ৩৫ তম বিসিএস (প্রশাসন) এ চান্স পেয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেছেন গত বুধবার। একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি জানান- কথায় আছে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম পড়াশোনা করে জীবনে অনেক বড় হব। সরকারী চাকরি করবো। কুমিল্লা বরুড়া উজেলার ৯নং দক্ষিণ শিলমুড়ী ইউনিয়নের বাঁশপুর গ্রামে আমার জম্ম, নিন্ম মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে কন্যা সন্তান হয়ে জম্ম লাভ করায় ছোটবেলা হতে বাবার দু:খ কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করতাম। পড়াশোনার পাশাপাশি মাঝে মধ্যে বাবা যে কৃষক তার অনুভব আমার মাঝে জাগতো। শুধু তাই নয়- ৩৫তম বিসিএস (প্রশাসন) এ চান্স পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করে আমার জম্মভূমি বাঁশপুর গ্রামের সকল কৃষককে আমি অনুভব করি। যদিও আমার বাবা সুলতান আহম্মদ একজন কৃষক, তারপরও আমার বাবা-মা দুইজনেই চাইতেন আমি যেন পড়াশোনা করে অনেক বড় সরকারী কর্মকর্তা হই। আজ বাবা মায়ের সেই স্বপ্ন সার্থক হয়েছে, আমি পেয়েছি আমার নতুনত্ব সাফল্য জীবন। বাঁশপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মা আমায় প্রথম শ্রেনিতে ভর্তি করে দেন এবং প্রথম থেকেই সবাইকে পিছনে ফেলে বার্ষিক পরীক্ষায় আমি ১ম স্থান অর্জন করি। বাবা মা দু’জনেই খুব খুশি হন আমার এমন সফলতা দেখে। শুরু হয় আমরা ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার প্রবল ইচ্ছা, কারণ আমি প্রতি শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে বাবা-মাকে সালাম করে খুব আনন্দ পেতাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে বাবা মা’র অন্তিম ভালোবাসায় আমি কুমিল্লা শহরের নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চান্স পাই। কুমিল্লা জেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চান্স পাওয়ার জন্য আমার প্রাথমিক শিক্ষকরা ও বাবা-মা’র অক্লান্ত পরিশ্রমই আমায় অনুপ্রেরণা জোগায়। স্কুলে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট এর পর মা বাবাকে ভাল সফলতা দেখাতে সক্ষম হই। যাক পরবর্তীতে ২০০৫ সালে নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ হতে “এ” প্লাস পেয়ে উর্ত্তীণ হই। সফলতার সহিত উর্ত্তীণ হওয়ার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হই। তারপর ২০০৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ হতে “এ” প্লাস পেয়ে কৃর্তিত্বের সহিত সফলতা অর্জন করি। এমন আনন্দের খবরে আমার মা আমাকে বুকে জড়িয়া নিলেন আর আমার অধ্যক্ষ স্যার আমাকে জড়িয়া ধরে কেঁদে উঠলেন। তারপর এখানে যেনো শেষ নয়। টেনশন যেনো বেড়ে যায়। মেডিকেলে যাবো নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো। তা নিয়ে বাবা-মা আরো বেশি টেনশন করেন। পরিশেষে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য পুরোদমে পড়াশুনা শুরু করি। প্রাইভেট শিক্ষকদের উৎসাহে আমি দিনরাত পড়াশোনা চালিয়া গেলাম। মনে পড়ে সে সময় আমি সারারাত পড়ি আর আমার মা আমায় অনুরোধ করে বলে মা একটু ঘুমাও আর কত পড়বে? ভর্তি পরীক্ষা দিলাম শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু এক দিন পর প্রকাশিত হল ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট। চান্স পাওয়া রেজাল্ট এ অন্যান্য রোল নাম্বারের পাশাপাশি আমার রোল নাম্বার প্রকাশ হলো। আনন্দের যেনো শেষ নেই। পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের মাঝেও আনন্দের শেষ নেই। অবশেষে অনার্স ও মার্ষ্টাস শেষ করার জন্য ২০০৭-২০০৮ সেশনে ফরেষ্ট বিষয়ে ভর্তি হলাম। শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ার সংবাদ পেয়ে আমার কৃষক বাবা আর গৃহিণী মায়ের বুকটা গর্বে ভরে গেলো। তারপরও যেনো পরিবারের দিকে চিন্তা থাকে। অন্যদিকে কন্যা সন্তান হয়ে পরিবারে জম্মলাভ করে পরিবারের জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা। তখন আমার একমাত্র ছোট বোন ও দুই ভাই স্কুলে পড়াশুনা করার কারনে কৃষক বাবাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সবার পড়াশোনা খরচ যোগানো বাবার অনেক কষ্ট হতো। কৃষক বাবা পরিশ্রম করে সামান্য যা আয় করতেন তা আমাদের পিছনেই ব্যয় করে দিতেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর কিছুটা নিজের কাছে স্বস্তি আসে, তা না হয় আসতো না। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর বাবা-মা আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন আমার পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্নাসে পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের হাত খরচ যোগান দিতাম। এমনিতে আমি পরিবারের মেয়ে সন্তান। অন্য দিকে আবার বড় সন্তান। তা নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতাম সবসময়। ফরেষ্টি বিষয়ে ২০১১ সালে ১ম ক্লাস পেয়ে শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্নাস শেষ করলাম। ধাপে ধাপে ২০১৩ সালে ১ম ক্লাস পেয়ে মার্ষ্টাসও শেষ করলাম। ৩৫ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে আমি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহাকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেছি। আমার সফলতার জন্য আমার বন্ধু মহলের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ, তারা আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার জন্য। কৃতজ্ঞ আমি আমার এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি।