।। মেজর মোহাম্মদ আলী সুমন (অব.) ।।
‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ বলতে আমরা কি বুঝি- এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হতে পারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্ভাব বজায় রেখে বসবাস করা। সেদিক বিবেচনায় কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ভাগলপুর গ্রাম অনন্য। এই গ্রাম এমনই এক গ্রাম যেখানে একই সাথে উদযাপিত হয় ঈদ ও পূজার অনুষ্ঠান এবং মুসলমান গ্রামবাসীর নিজ ধর্মের প্রতিবেশীর চেয়েও হিন্দু প্রতিবেশীর সাথে আছে বেশি সম্পর্ক।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির শহীদনগর বাস স্টেশন থেকে একশত গজ দক্ষিণে এ গ্রামের অবস্থান। এ গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ১২ শত। এর মধ্যে ১৫টি হিন্দু পরিবারের লোক সংখ্যা রয়েছে ৭০ জন। মুসলিম পরিবারের সংখ্যার তুলনায় তা নগন্য হলেও ভাগলপুর গ্রামের হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে ঐক্য। এর উজ্জল দৃষ্টান্ত মুখোমুখি মাদ্রাসা ও মন্দির। ঈদ, পূজা-পার্বন সহ সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গ্রামের হিন্দু-মুসলিম একে অপরকে সহযোগিতা করে।
২০১১ সালের ৫ জানুয়ারী ভাগলপুর গ্রামের বিশিষ্টজন অ্যাডভোকেট সফিউল বসর ভান্ডারী ভাগলপুর ফকির আব্দুল হাকিম ফরিদুন্নেছা মাইজভান্ডারী ফোরকানিয়া মাদ্রাসা উদ্বোধন করেন।এর ঠিক দুই বছর পর মাদ্রাসার সামনে মুখোমুখি ২০ ফুট দূরে একই গ্রামের ডাঃ পবিত্র মোহন সূত্রধর এর বাড়ীতে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রী শ্রী মহামায়া মন্দির।মুখোমুখি মাদ্রাসা ও মন্দির হওয়ায় উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কখনো কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বা কোন বিরোধ হয়নি। বরং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে এক সম্প্রদায়ের লোক অপর সম্প্রদায়কে দাওয়াত করেন। ইতিহাস বলে এই গ্রামে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তো দূরের কথা কোন দ্বন্দ্বও হয়নি। এটা ভাগলপুরবাসীর অর্জন, এটা তাদের অহংকার। এটা অটুট রাখতে ঐক্যের দেয়াল গড়ে তুলতে হবে।
আমি সরেজমিনে দেখেছি, সেখানে হিন্দু-মুসলিম মিলে-মিশে সুখে-শান্তিতে আছে, কোন উত্তেজনা নেই, নেই কোন উম্মাদনা। কে মুসলমান, কে হিন্দু কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই সমান অধিকার ভোগ করছে। স্কুল কলেজে কোন ভেদাভেদ নেই। হাটে-বাজারে কোনো গোলযোগ নেই, হিন্দু-মুসলিম একসাথে চলছে। লেখা-পড়া করছে, একই দোকানে বসে চা পান করছে, একই হোটেলে বসে খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন করছে। মুসলমান বরের সাথে হিন্দুরা বরযাত্রী সেজে যাচ্ছে। হিন্দু বরের সাথেও মুসলমান বন্ধুরা বরাগমন করছে। এসবই হচ্ছে, এ গ্রামের সনাতন ধারা। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সময় মসজিদে যেমন আযান দেওয়া হয় তেমনি মন্দিরে শংখ কাসার ঘন্টা বাজে। এই মনোহর দৃশ্য কেবল ভাগলপুর গ্রামে নয় বা দাউদকান্দি উপজেলায় নয়, সর্বত্র-সারা দেশে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পযর্ন্ত একই দৃশ্য, একই পরিবেশ দেখার প্রত্যাশা করি।
লেখক: উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।