।। বিশেষ প্রতিনিধি।।
এবার ঈদের ছুটিতে বিনোদন উপভোগ ও ঘুরতে যেতে অনেকেই বেছে নিয়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দির জুরানপুর কমপ্লেক্সকে। ঈদের দিন বিকেল থেকেই ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখড়িত গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত এই কমপ্লেক্স। বিশেষ করে কুমিল্লার দাউদকান্দি, মেঘনা, হোমনা, তিতাস, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, চাঁদুপুরের উত্তর ও দক্ষিণ মতলব এবং কচুয়ার এলাকার লোকজনের ব্যাপক সমাগম দেখা গেছে জুরানপুর কমপ্লেক্সে।
শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণির ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এখানে রয়েছে বিনোদনের নান্দনিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য্য। এরমধ্যে লেক এবং লেকের একাংশে স্থাপিত বৈকালী ব্রিজ ব্যাপক অাকর্ষিত করছে ভ্রমণপিপাসু ও পর্যটকদের।
ছবি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এবারের ঈদে সপরিবারে বেড়াতে যান জুরানপুর কমপ্লেক্সে। ছবিটি তার ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।
কমপ্লেক্সের এরিয়াটি শহরের আদলে তৈরি। যেন গ্রামের ভিতর পুস্পশোভিত ছায়াঘেরা একটি শহর। যে কেউ একবার দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দেশের বিনোদনপ্রিয়দের কাছে এটি পিকনিক স্পট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে অনেক আগেই। এই ক্যাম্পাসটিতে সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিসেবী, সমাজসেবক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদচারণা পড়ছে নিয়মিতই। তাই এবার ঈদে এ অঞ্চলের মানুষের প্রথম পছন্দই ছিল এই কমপ্লেক্স। ঢাকা থেকেও বেড়াতে যাচ্ছেন অনেকেই। কেউ কেউ সপরিবারে বেড়াচ্ছেন এখানে।
ছবি : হ্রদের ওপর নান্দনিক বৈকালী ব্রিজ।
প্রকৃতিপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি ও মেঘনা) আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মো. সুবিদ আলী ভূঁইয়া।
‘দেশপ্রেম শুরু হয় নিজের গ্রামকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। নিজের এই কথাকে দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে চাকরির ফাঁকে ফাঁকে দীর্ঘ তিন দশক ধরে কঠোর মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে সুবিদ আলী ভূঁইয়া তিলে তিলে গড়ে তোলেন তার নিজ গ্রাম জুরানপুরে এই বিশাল কমপ্লেক্স। চাকরি জীবনের শুরুতে বলা যায় অনেকটা মনের অজান্তেই এলাকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। সশস্ত্র বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ অফিসার হয়েও গ্রামের লোকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। এলাকার গরীব-দুস্থ অসহায় মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে তাদের পাশে থেকেছেন। চাকরিকালীন সময়েই দাউদকান্দি উপজেলা থেকে ৪ কি.মি. দক্ষিণে সুবিধাবঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য ১৯২ বিঘা জমির উপর গড়ে তুলেন বিশাল এই কমপ্লেক্স। যার সিংহভাগজুড়ে রয়েছে সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি, ডাকঘর, ব্যাংক, হাসপাতাল, বাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, স্টেডিয়াম, কবরস্থান ৪০টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, এতিমখানা ও ছাত্রাবাস।
ছবি : হ্রদে রয়েছে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা।
এলাকাবাসীর অনুরোধে ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জুরানপুর আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ মনোরম পরিবেশে গড়ে তুলেন এই কলেজটি। যাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ৭টি ছাত্রাবাসও রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছরই বোর্ডে মেধা তালিকায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে কলেজটি। বর্তমানে কলেজটিতে কয়েকটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে।
সমাজের অসহায় অবহেলিত পিতৃমাতৃহীন এতিম ও নিঃস্ব ছিন্নমূলদের আশ্রয় ও সেবার জন্য ১৯৮৩ সালে গড়ে তুলেন একটি এতিমখানা। যা অনাথ এতিমদের একটি সুন্দর ঠিকানা। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের দেশে একটা প্রবণতা আছে কেউ কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান করলে তা নিজের নামে করে থাকেন কিন্তু জেনারেল ভূঁইয়া এ থেকে ব্যতিক্রম। তিনি এ ধরনের সংকীর্ণতাকে আশ্রয় দেননি। অথচ উন্নত বিশ্বে কোন প্রতিষ্ঠান নিজের নামে করার কথা কল্পনাও করা যায় না।
নিজ গ্রামকে উচ্চতর আসনে স্থান দিতে গিয়ে কলেজটির নামকরণ করেন জুরানপুর আদর্শ কলেজ। কলেজটিকে রাখা হয় ধূমপান ও রাজনীতি মুক্ত। যাত্রার শুরুর পর কিছুদিনের মধ্যেই কলেজটির সুনাম ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপী। ফলে সারা দেশ থেকে শত শত শিক্ষানুরাগী মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নের জন্য আসে এখানে। জ্ঞানচর্চার অনুকূলে পরিবেশ এসে পাল্টে গেছে এলাকার জীবনচিত্র। কেবল পুঁথিগত বিদ্যাই নয়, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায় এবং সুষ্ঠু জীবনবোধ সম্পর্কে শিক্ষাদানের জন্য সকলেই মডেল হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে এই আদর্শ প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রতি বছরই ছাত্র-ছাত্রীরা কলেজকে সম্মানীত করে তাদের কৃতিত্ব দিয়ে। মেধা তালিকায় ছাত্র-ছাত্রীদের অবস্থান ছিল গর্ব করার মত। সুবিদ আলী ভূঁইয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কমপ্লেক্সে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও কোনটিই নিজের নামে করেননি তিনি। দুটি উদাহরণ থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
৭টি ছাত্রাবাসের মধ্যে একটির নাম হযরত আলী ছাত্রাবাস। এর নামকরণেরও একটি ইতিহাস রয়েছে। দাউদকান্দির তালতলী গ্রামের বাসিন্দা মরহুম হযরত আলী ছিলেন জেনারেল ভূঁইয়ার আরবি শিক্ষক। যাঁর কাছে তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। তাঁর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা করেন হযরত আলী ছাত্রাবাস।
ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসীর বিনোদন তথা খেলাধুলার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি স্টেডিয়াম। যেটি নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম নামে। শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণির মানুষদের জন্য রয়েছে বিনোদনের মাধ্যম।
তাই এবারের ঈদের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা বিনোদনের জন্য বেছে নিচ্ছেন জুরানপুর কমপ্লেক্স।
ছবি : হ্রদের ওপর নান্দনিক নর্থ-সাউথ ব্রিজ।