অপরাজেয় বাংলা

||নিজস্ব প্রতিনিধি|| ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯ – সাত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, বাধা বিপত্তি পেরিয়ে শেষ হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যের নির্মাণ । একদিন যা শুধুই ছিল কল্পনা,বুঝি বা স্বপ্ন, পাথর কেটে মূর্ত করে তুলেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্বনামধন্য শিক্ষক শিল্পী অধ্যাপক আবদুল্লাহ খালিদ। গর্ব বোধ করতাম সহকর্মী হিসেবে যখন তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতাম। চট্টগ্রামে নেভাল একাডেমী তে ডলফিনের ভাস্কর্য এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে র ভাটিয়ারিতে গল্ফ ক্লাবে গল্ফারের ভাস্কর্য তাঁরই করা।

অপরাজেয় বাংলা নিয়ে নানা বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, ধর্মান্ধরা এসেছিল নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা রক্ত ঢেলে প্রতিহত করেছে সেই হামলা, রুখে দাঁড়িয়েছে গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিরোধ ,মুক্তি ও সাফল্য কে ধারণ করেছে এই পাথুরে শিল্প। অল্প দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, যার ধূলি-মাটিতে গেঁথে আছে বাঙালি জাতির অজেয় ইতিহাস । একাত্তরে এইখানেই প্রথম উড়েছিল স্বাধীনতার পতাকা । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ইতিহাসে পালন করেছে শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য তার অহংকারে সংযুক্ত করে দিল নূতন গৌরব।

কলাভবনের সামনে আইল্যান্ড এর ওপর তৈরি হয়েছে ত্রিকোণ বেদী – মাটি থেকে ১৮ ফুট উঁচু, বেদীর ওপর ১২ ফুট উঁচু তিনটি ফিগার। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সশস্ত্র দুই যোদ্ধা পুরুষ, ফার্স্ট এইড বক্স সঙ্গে শুশ্রূষা র উৎস এক নারী। এদের শরীর পাথরের নয়,একটি জাতির রক্তাক্ত অভ্যুদয়, বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয় সঞ্চালিত হচ্ছে এদের হৃৎপিন্ডে,শিরা উপশিরায়।

দীর্ঘ প্রায় সাত বছরে দেশের সার্বিক ক্ষেত্রে ঘটেছে পালাবদল,এই ভাস্কর্যের ওপরও তার প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পড়েছে । অর্থনৈতিক কারন ছাড়াও নানাবিধ কারনে এর নির্মাণ কাজ ব্যহত হয়েছে একাধিকবার । স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তাল স্মৃতি কে শিল্পরূপে মন্ডিত করে তুলতে অপরিসীম পরিশ্রম করেছিলেন আবদুল্লাহ খালিদ,সহকারী বদরুল আলম বেণু। এই কাজের সঙ্গে সব পর্যায়ে সংযুক্ত ছিলেন ম. হামিদ।

দেশপ্রেমের উজ্জীবনে তাড়িত এই শিল্পীরা দিনের পর দিন,বছরের পর বছর অনলস শ্রম,মেধা ও দুঃসাহস দিয়ে করেছেন এর প্রাণসন্চার । এই পথ পরিক্রমা প্রচন্ডভাবে বিঘ্নিত করেছে তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন। অনিশ্চয়তা তাঁদের আক্রান্ত করেছে বারবার, চক্রান্তের হাত বহুবার গ্রাস করতে এগিয়ে এসেছে । কিন্তু পিছিয়ে যাননি তারা, দুর্জয় মনোবলে পদদলিত করেছেন সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা । একটি জাতির আত্মচেতনার উন্মেষ, তার বিকাশ ও উপলব্ধি সার্বক্ষণিক প্রেরণা ছিল বলেই এটা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে ।

১৯৭৭ সালে প্রতিক্রিয়াশীলরা জিপিওর সামনে থেকে একটি ভাস্কর্য অপসারিত করে। তাদের দ্বিতীয় শিকার হয়েছিল এই ভাস্কর্যটি । ১৯৭৭ সালের ২৮ আগস্ট তারাই ভাস্কর্যটি নির্মূল করার উদ্যোগ নেয় । স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র রা তা প্রতিহত করে। অনিবার্য সেই সংঘর্ষে ৩০ জন ছাত্র আহত হয়, চারজন গ্রেফতার হয় । এই ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে ছাত্র সমাজ,দাবি ওঠে অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার।

স্বাধীনতা এসেছে লাখো শহীদের রক্তের পথ বেয়ে,সেই স্বাধীনতার স্মৃতিকে মর্যাদা দিতে প্রয়োজনে আরো রক্ত দিতে হবে – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এ ব্যাপারে কোনোদিন কুন্ঠিত ছিল না ,থাকবে ও না।

★জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড.কামাল‌উদ্দীন এর ফেসবুক ওয়াল থেকে।

Comments (0)
Add Comment