।। বিশেষ প্রতিনিধি ।।
(সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় পর্ব)
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি বাঙালি মা-বোনেরাও সম্মুখসমরে অংশগ্রহণসহ নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অনেক মা স্বেচ্ছায় তার আদরের পুত্রকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। অনেক গৃহবধূ তাঁর স্বামীকে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছেন, কেউ কেউ স্বামীকে নানাভাবে সাহস-উৎসাহ যুগিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে পরোক্ষভাবে অবদান রাখা এমনই একজন নারী মাহমুদা আক্তার। ১৯৭১ সালে মাহমুদা আক্তার ছিলেন সদ্য বিবাহিতা। গর্ভে সন্তান থাকার পরও স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে বারবার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পাঠিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য। তাঁর সাক্ষাৎকারের উঠে এসেছে ২৫, ২৬ ও ২৭ মার্চ ১৯৭১, চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া গা শিউরে ওঠা নানা ঘটনা।
৭ মার্চ ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। ঐতিহাসিক এই ভাষণের পর শহর ও গ্রামে বাঙালিরা স্বাধীনতা জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অপরদিকে, পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন আলোচনার নামে টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করে বাঙালিদের ওপর হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য। পুরো পূর্ববাংলায় তখন থতথমে পরিস্থিতি। একজন বাঙালি আর্মি অফিসারের স্ত্রী হিসেবে এ সময়টা কীভাবে পার করেছেন। কী দেখেছে এবং শুনেছেন ?
তখন আমাদের বাসা ছিল চট্টগ্রামের বায়জীদ বোস্তামি সড়কের শেরশাহ কলোনিতে। সেখানে অন্যান্য আর্মি অফিসারের পরিবারের বাসাও ছিল। তখন বিভিন্ন জায়গায় বিহারীদের সঙ্গে বাঙালিদের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর আসছিল। চট্টগ্রামের পরিস্থিতিও ভালো নয়। মার্চে আমাদের বাসায় নিরাপত্তা প্রহরী রাখার ব্যবস্থা করা হয়। পরিস্থিতি খারাপ দেখে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের কমান্ডার আমার স্বামীকে নির্দেশ দেন, আমাদের বাসা যেন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ভিআইপি আবাসিক এলাকায় নিয়ে যান। তখন আমি বললাম, বাসা পরিবর্তন তো অনেক ঝামেলার কাজ। আবার আমি তখন গর্ভবতী। আমরা পরিস্থিতি আরেকটু দেখে সিদ্ধান্ত নেই। এরপর আমরা ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ওই বাসাতেই ছিলাম।
২৫ ও ২৬ মার্চের ঘটনা-
তখন ক্যাপ্টেন ভূ্ইঁয়া ২৬ মার্চ ভোরেই ঘুম থেকে ওঠে যান। আর্মিরা তো ভোর থেকেই পিটি করে। ভোরে একজন সৈনিক দৌড়ে বাসায় আসে। বলে, স্যার সব শেষ হয়ে গেছে। ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈনিক ও অফিসারদের মেরে ফেলেছে পাকিস্তানি অফিসাররা। তখন ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া আমাকে বললেন, তুমি পাশের বাসায় গিয়ে আপাতত থাকো। আমি পরিস্থিতি দেখে আসি। এরপর সাইকেলটা নিয়ে বের হয়ে গেলেন।
তখন কী বাসায় আপনি একাই ছিলেন ?
হ্যাঁ, বাসায় আমি একা।
খবর পেলেন ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈনিক ও অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে। এদিকে আপনি গর্ভবতী কিশোরী বধূ। আবার বাসায় একা। এ অবস্থায় স্বামীকে যেতে দিলেন কী করে ?
বাঙালি আর্মিদেরকে মেরে ফেলেছে- এটা জানার পর কাঁপছিলাম। কিন্তু স্বামীকে যেতে বাধা দেইনি। কেনো দেইনি জানি না। আমি তাঁকে কিচ্ছু বলি নি। উনি যে গেলেন দুপুর হয়ে গেল, ফিরে আসার কোনো খবর নেই। তখন আমার মনে ভয় ঢুকলো। আমি পাশে আমার এক ক্লাসমেটের বাসায় চলে গেলাম। বিকেলে হয়ে গেল। তখনো কোনো খবর নাই। ভয়ে কাঁপছি- ক্যাপ্টেন ভূঁইয়াকেও পাকিস্তানি আর্মি ফেরে ফেলল কিনা। আমার সহপাঠীর বাবা-মা আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। টেনশনে টেনশনে রাত চলে এলো। তখনো স্বামীর কোনো খবর নেই। লোকজনের কাছে খবর পাচ্ছি, অমুক অফিসারকে মেরে ফেলেছে, তমুককে মেরে ফেলেছে। আমি কান্না শুরু করে দিলাম। ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া কোথায়-কেমন আছি জানি না। কোথায় কাকে ফোন দেবো তাও জানি না। আমি খালি আল্লাহকে ডাকছি। ২৬ মার্চ রাত গেল কেনো খবর নেই। ২৭ মার্চ সকালেও কোনো খবর নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, তখনো খবর নেই। গর্ভে সন্তান, কী করবো বুঝে ওঠতে পারছি না। এরমধ্যে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে কুমিরার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার কিছুই জানি না। আমার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে প্রতিনিয়ত। তবে আমার বিশ্বাস ছিল যে উনি বেঁচে আছেন এবং আমার কাছে ফিরে আসবেন। …
উল্লেখ্য, মাহমুদা আক্তারের স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া [কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি ও মেঘনা) আসনের টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মো. সুবিদ আলী ভূঁইয়া] বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কাতারের একজন বীরযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তখনকার সেই তরুণ ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া দেশ ও জাতির মুক্তির লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা দিয়ে পুরো নয় মাস জীবনবাজি রেখে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লড়াই ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক কুমিড়ার লড়াই তাঁর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিল। যা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শাহপুর খান বখতিয়ার ও একজন লেফটেনেন্টসহ বিভিন্ন পদে ১৫২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
কুমিড়ার এই লড়াইটিই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম ও মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কুমিড়ার যুদ্ধের এই সাফল্য ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট।
জেনারেল ভূঁইয়া ৩নং সেক্টরের তেলিয়াপাড়া, ধর্মগড়, মুকুন্দপুর, আশুগঞ্জের যুদ্ধেও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। উল্লেখ্য, নয় মাসের যুদ্ধে বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মরতে মরতেই তিনি বেঁচে যান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে এবং পরে সিলেট অঞ্চলে মেজর সফিউল্লাহ নেতৃত্বে দেশ শত্র মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধে লড়ে যান তিনি