গর্ভে সন্তান, পথে পথে বৃষ্টি ও কাদা, সীমাহীন কষ্টে আগরতলা পৌঁছাই : মাহমুদা আক্তার

।। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও লেখা : বাশার খান।।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি বাঙালি মা-বোনেরাও সম্মুখসমরে অংশগ্রহণসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনেও অনেক মা তার আদরের পুত্রকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, অনেক গৃহবধূ তাঁর স্বামীকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছেন। রান্না করে খাইয়েছেন, চিকিৎসা-সেবা দিয়েছেন। ঘরে মুক্তিবাহিনী রেখে রাতভর বাড়ির সামনে পাহারা দিয়েছেন; এ কারণে অনেক নারীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অনেকে বিসর্জন দিয়েছেন সম্ভ্রম। স্বাধীনতার জন্য বাঙালি নারীর ত্যাগের শেষ নেই।

মুক্তিযুদ্ধে পরোক্ষভাবে অবদান রাখা এমনই একজন নারী মাহমুদা আক্তার। ১৯৭১ সালে মাহমুদা আক্তার ছিলেন সদ্য বিবাহিতা। গর্ভে সন্তান থাকার পরও স্বামী তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া [বর্তমানে কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. সুবিদ আলী ভূঁইয়া] কে বারবার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পাঠিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য। ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় থেকে সময় সুযোগ করে স্বামীকে যুদ্ধে নিয়োজিত থাকতে সাহস যুগিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহ করে সুবিদ আলী ভূঁইয়া মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্রামের বাড়ি চলে আসেন মাহমুদা আক্তার। এখানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে তাঁকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি ছিল প্রতিনিয়ত। কারণ ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কুমিরার যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মারাত্মভাবে বিপর্যস্ত হয়; যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া। এ কারণে সুবিদ আলী ভূঁইয়ার নামটি  ছিল আলোচিত।

নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে মাহমুদা আক্তার ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন বর্ষাকাল। প্রতিদিনই বৃষ্টি হয়, কর্দময় পথঘাট। এমন বাস্তবতায় গর্ভে ৭ মাসের সন্তানকে নিয়ে হেঁটে-রিকশায় ত্রিপুরা যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

সেই কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণে মাহমুদা আক্তার বলেন,
‘জুলাই মাসে পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকাররা আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। কয়েকদিন পর লোক মারফত তখনকার ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া এ খবর জানতে পারেন। এরপর তিনি আমাদের পাশের গ্রাম ঝাউতলীর এক ছাত্র একরামকে [আকরাম দেশ স্বাধীন হলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং মেজর হন] চিঠি দিয়ে পাঠান- আমি যেন আকরামের সঙ্গে আগরতলা যাই। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার পর আমরা তখন বড় বোনোর শ্বশুড় বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানেই চিঠি নিয়ে আসলো আকরাম। আমি তখন ৭ মাসের গর্ভবতী।  মোহাম্মদ আলী সুমন (পরে মেজর ও বর্তমানে দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান) তখন আমার পেটে। আমার পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়ে যে, আমাকে এই অবস্থায় যেতে দিবে কিনা। জীবনের ঝুঁকি থাকার পরও আমি যেতে রাজি হলাম। কারণ খুবই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার স্ত্রী আমি। আমাদের বাড়িঘরে হামলা ও আগুনে জ্বালিয়ে দেয়ার পর অবরুদ্ধ বাংলাদেশে থাকাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
অপরদিকে যুদ্ধে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়াকে পাশে থেকে সাহস যোগানো সেই মূহূর্তে খুবই দরকার মনে করেছিলাম। যেদিন দাউদকান্দি খানেবাড়ির বাড়ি থেকে বের হই- আমার বাবা মহিউদ্দিন আহমদ হাতে ৫ হাজার টাকা দেন। পথে চুরি-ডাকাতি হতে পারে এই আশঙ্কায় টাকাটা দুই ভাগে ভাগ করে দেন বাবা। মা বোরকা পরিয়ে দিয়ে খুব কাঁদছিলেন সেদিন।

হেঁটে-রিকশায়-নৌকায় দাউদকান্দি থেকে আগরতলা যাই। লম্বা পথ, কষ্টের সীমা নেই। পথে অনেক কষ্ট হয়। আল্লাহর মেহেরবানি ছিল যে, পথে পাকিস্তানি আর্মির কোনো টহল বা চেকপোস্টে পড়ি নাই। হাঁটতাম আর আল্লাহকে ডাকতাম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কংসনগরের একটি বাড়িতে একদিন অবস্থান নেই। ওই বাড়ির লোকজন খুব উপকার করেছিল। তখন আমার সঙ্গে যাওয়া আমার দেবর আবুল হোসেনের খুব জ্বর আসে। এরপর ঐ বাড়ির লোকজনের সহযোগিতায় আমি, আমার দেবর ও একরাম সীমান্ত পার হই। সীমান্ত পার হওয়ার পর খুব বৃষ্টি শুরু হয়। পথে পথে বৃষ্টি ও কাদা। এইদিকে ক্ষুধায় মরে যাই। কী খাবো? হাঁটছি বন-জঙ্গল আর অচেনা পথে। ক্ষুধার জ্বালায় কাঁঠাল কিনে খাই। শরণার্থীরা সীমান্ত পার হয়ে চাঁদের গাড়িতে করে আগরতলা যায়-কিন্তু সেদিন তুমুল বৃষ্টি হওয়ায় চাঁদের গাড়ি আসেনি। তাই শরণার্থী বহরের সঙ্গে পায়ে হেঁটে রওয়ানা হই। পথে পথে কাঁদা, পেটে সন্তান- হাঁটাও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ! তারপরও মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে। এ ছাড়া কোনো উপায় তো ছিল না। প্রায় ১২ মাইল হাঁটার পর একটা জিপগাড়ি পেলাম। সেটাতে করে আগরতলা পৌঁছলাম।’

উল্লেখ্য, মাহমুদা আক্তার প্রথমে ভারতের ত্রিপুরার সাংবাদিক শ্রী অনিল ভট্টাচার্যের (বাংলাদেশের বন্ধু সম্মাননাপ্রাপ্ত) বাসায় আশ্রয় নেন। ১৮ অক্টোবর ১৯৭১, আগতলা শহরের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হসপিটালে (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল হসপিটাল) সুবিদ আলী ভূঁইয়া ও মাহমুদা আক্তার দম্পতির প্রথম সন্তান মোহাম্মদ আলী সুমন জন্মগ্রহণ করেন। হাসপাতালে নবজাতকের সার্বিক দায়িত্বপালন করেন সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের স্ত্রী সুনন্দা ভট্টাচার্যী।

প্রয়াত সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্য ও তাঁর স্ত্রী সুনন্দা ভট্টাচার্যী।
ছবি: লেখক কর্তৃক সুনন্দা ভট্টাচার্যীর কাছ থেকে সংগৃহীত।

মাহমুদা আক্তারের স্বামী মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরো নয় মাস বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা- ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক কুমিরার লড়াই তাঁর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিল। যা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শাহপুর খান বখতিয়ার ও একজন লেফটেনেন্টসহ বিভিন্ন পদে ১৫২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
কুমিরার যুদ্ধের এই সাফল্য ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ২৯ মার্চ ১৯৭১ সালে তাঁর নামে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের মদনাঘাটস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একটা ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ঘোষণাটি ছিল ‘যার যার অস্ত্র নিয়ে লালদীঘি ময়দানে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার কাছে রিপোর্ট করুন’।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জে. (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া, এমপি।

পরে সুবিদ আলী ভূঁইয়া ৩নং সেক্টরের অধীনে তেলিয়াপাড়া, ধর্মগড়, মুকুন্দপুর, আশুগঞ্জের যুদ্ধেও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে এবং পরে সিলেট অঞ্চলে মেজর সফিউল্লাহ-এর নেতৃত্বে দেশ শত্রু মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধে লড়ে যান তিনি।

(সাক্ষাৎাকার ও লেখার কিছু অংশ পূর্বপ্রকাশিত)

Comments (0)
Add Comment