যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, “মুক্তিযোদ্ধা কোটা” তত দিন থাকতেই হবে

।। মেজর মোহাম্মদ আলী সুমন (অবঃ) ।।

কোটাব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর কথাবার্তা, মতামত, লেখালেখি হচ্ছে। বলা বাহুল্য, পক্ষে কম, অধিকাংশ মতামতই বিপক্ষে। তবে বিপক্ষকারীদের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার মূল বিষয় না। আমার মনে হয়, এই বিতর্ক আজ এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এর সংস্কার জরুরি। তবে সেই সংস্কারে এটাও বিবেচ্যে থাকতে হবে যে, বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা তত দিন থাকতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা, জীবন উৎসর্গ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, তাদের বংশধররা সুবিধা ভোগ করবেন- এটা স্বাভাবিকভাবেই মানতে হবে।

আমি নিশ্চিত, একজনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিগত লাভ বা পদ-পদবির আশায় যুদ্ধে নামেননি। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে স্বাধীন করেছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাকরিতে এ কোটা থাকতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান,এ বিষযে কারো সংশয় নেই। তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হোক, তা সবারই কাম্য। তাদের অবদানের প্রতিদান দেয়া কিংবা তাদের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বর্তমান সরকার তাদের পুনর্বাসন ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা আগের কোনো সরকার করে যায়নি। সুতরাং এই সরকারের কাছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবী থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

সময়ের দাবীতে কোটা সংস্কার হতে পারে, কোটা পরিমাণ কম-বেশীও হতে পারে তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকতেই হবে। এটি কোন উদ্ভট বা অযৌক্তিক ব্যবস্থা নয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সিভিল সার্ভিস (যেখান থেকে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের উৎপত্তি) সেখানেও এতবৎসর পরেও “মুক্তিযোদ্ধা কোটা” বিদ্যমান আছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, এ কথাটা ভুললে চলবে না। কাজেই তাঁদেরকে আমাদের যথাযথ সম্মান দিতেই হবে। তাঁদের ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি পর্যন্ত যাতে চাকরি পায়, সে জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যবস্থা থাকতেই হবে।

মুক্তিযোদ্ধা অথবা তার পরিবারের সদস্যরা কোন সময় কোটার দাবি করেনি, করবেও না।জাতির দায়িত্ব হচ্ছে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্বীকৃতি দেওয়া। জাতির দায়িত্ব হচ্ছে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা।

কোটা আন্দোলনের নামে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারদের হেয় প্রতিপন্ন করেছেন।যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যা জাতির জন্য অশনিসংকেত। সরকারকে অনুরোধ করবো, যারা মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবার সম্পর্কে কটূক্তি অথবা ব্যঙ্গ করবে, তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘কোটা যদি পূরণ না হয়, তাহলে শূন্য পদে সাধারণ চাকরিপ্রার্থী মেধাবীদের নিয়োগ দিতে কোটার বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে।‘ সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকলে মেধাবীদের বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। যদি মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন না করতেন, তাহলে আমরা কোনো চাকরি পেতাম না। তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজকের এই চাকরির সুযোগ, আজকে এই স্বাধীনতা, আজকে মানুষের এই উন্নয়ন সব তাদের জন্য। যদি দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে কোনও উন্নয়নও হতো না, কারও কোনও চাকরিও হতো না। কোনও উচ্চ পদেও কেউ যেতে পারতো না-এ কথাটা ভুললে চলবে না। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকতেই হবে।

প্রয়োজনমতো সময়, শ্রম, চেষ্টা বিনিয়োগ করে হয়তো এমপি হওয়া যায়, মন্ত্রী হওয়া যায়, রাজনৈতিক দলের মালিক হওয়া যায়; কিন্তু চাইলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না। এ সুযোগ ইতিহাস আমাদের একবারই দিয়েছিল। যাঁরা সেদিন দেশ ও মানুষের মর্যাদা ও মুক্তির লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের অবহেলা করে এই জাতি কখনোই বড় হতে পারবে না।

যে জাতি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে জানেনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়া কে বৈষম্য মনে করে, সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।

আমার এ দাবি যে সর্বোৎকৃষ্ট, এমন দাবি করার ধৃষ্টতা আমার নেই। এ নিয়ে চর্চা হোক, এই আমার প্রত্যাশা। আমি আশাবাদী, এর চেয়ে আরও ভালো সমাধান নিশ্চয় বেরিয়ে আসবে। তবে যত দিন বাংলাদেশ থাকবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা তত দিন থাকতেই হবে।

লেখকঃ কুমিল্লা জেলা ও চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

শেয়ার করুন:

Related posts