ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বাংলাওয়াশ টাইগারদের

সোনালি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতোই দৃশ্য! ক্যারিবীয়দের শেষ ব্যাটসম্যান শেরম্যান লিউইসের বিপক্ষে আম্পায়ার রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ আঙ্গুল তুলতেই গোটা স্টেডিয়াম মেতে উঠে বাধভাঙা উচ্ছ্বাসে। ঐতিহাসিক জয়কে রংধনুর সাত রঙে রাঙাতে জয়োত্ফুল্ল ক্রিকেটাররা দৌড়ে বেরিয়ে আসেন সাজঘর থেকে। সতীর্থদের ভালোবাসার আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলতে কাভার থেকে ভোঁ দৌড় ইতিহাস গড়া জয়ের নায়ক সাকিবের। জয়ের ‘স্মারক’ উইকেট চোখের পলকে তুলে নেন তাইজুল। শো কেসের শোভাবর্ধন করতে আম্পায়ার থেকে লাল রঙের গোলাকার চর্মটি চেয়ে নেন জয়ের মহানায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। উইকেটের আরেক প্রান্তে উইকেটরক্ষক মুশফিককে ঘিরে জয়োৎসবে উন্মাতাল মাহমুদুল্লাহ, লিটন, সৌম্যরা। চোখ জুড়ানো ও মন ভোলানো অসাধারণ এক দৃশ্য! ২ ডিসেম্বর শীতের বিকালে মিরপুর স্টেডিয়ামের অসাধারণ হয়ে উঠা মুহূর্তটিকে সোনালি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখাই যায়!

ইতিহাসের প্রথম ইনিংস জয়ের সুখের সঙ্গী  হতে গ্যালারি থেকে আনন্দে মাতোয়ারা ক্রিকেটপ্রেমীরা স্মার্ট ফোনে বন্দী করে রাখছেন ক্রিকেটারদের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে।

জুলাই থেকে ডিসেম্বর: পাঁচ মাসের ব্যবধানে মধুর প্রতিশোধ। সেটা আবার বিজয়ের মাসে। আহা! কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! সাদা পোশাকে পথ চলার বয়স দেড় যুগ। ২০০০ থেকে ২০১৮, কত দুঃস্বপ্নের রাত পার করেছেন ক্রিকেটাররা। লজ্জার নোনা জলে কতবার সিক্ত হয়েছেন। ব্যর্থতার কালো চাদরে ঢাকা পড়ে গুমড়ে কেঁদেছেন কতবার। সমালোচকদের তীক্ষ্ন তরবারিতে এফোড়-ওফোড় হয়ে আড়ালে থেকেছেন। তবে হাসেননি এমনটি নয়। হেসেছেন। জয়োৎসবে মেতেছেন। প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে ক্রিকেটপাগল বাঙালি জাতিকে রাঙিয়েছেন লাল, নীল, সবুজ, আকাশি রঙে। কিন্তু এবারের মতো এত খুশি, আনন্দ, উত্ফুল্ল বোধ করি আর কখনোই হননি। ইনিংস ও ১৮৪ রানের জয়ই তার মূল কারণ, সেটা নয়। প্রতিশোধের সুখও যে রয়েছে আড়ালে।

জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ৪৩ রানে গুটিয়ে লজ্জায় ডুবেছিলেন সাকিবরা। হোয়াইটওয়াশ হয়েছিলেন টেস্ট সিরিজে। যদিও টি-২০ ও ওয়ানডে সিরিজ জিতে দেশে ফিরেছিলেন মাথা উঁচু করে। কিন্তু মনের গহিনে প্রতিশোধের যে আগুন ধিক ধিক করে জ্বলছিল, সেই আগুনে পুড়িয়ে দিতে ইস্পাতসম দৃঢ়তায় নিজেদের শানিয়েছেন সাকিবরা। ঘরের মাঠে ক্যারিবীয়দের প্রতিশোধের আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করতে উইকেটের চরিত্রই পাল্টে ফেলেছেন স্বাগতিকদের সুবিধায়। লাটিমের মতো যেন বল ঘুরে, সেজন্য উইকেটকে বানানো হয়েছে স্পিনারদের চারণভূমি। সাকিব, মিরাজ, তাইজুল ও নাঈম-স্পিনার চতুষ্টয়ের গোখরো সাপের ফণার মতো সুঁচালো ছোঁবল থেকে এমন উইকেটে জান বাঁচাতে লড়াই করেছেন ব্রেথহোয়েইট, হেটমায়ার, শাই হোপস, পাওয়েল, চেইজরা। কিন্তু ফুসে উঠা ফণার তীব্র বিষে নীল হয়ে ফিরে গেছেন সাজঘরে। সঙ্গে করে নিয়ে যান ব্যর্থতার করুণ গল্প।

১৮ বছর আগে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে যাত্রা শুরু বাংলাদেশের। দীর্ঘ পথ চলায় মিরপুরে খেললো ১১২ নম্বর টেস্ট। এরই মধ্যে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েকে। হারিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। কিন্তু এবারই প্রথম কোনো দলকে ফলোঅনে ফেলে ইনিংস জয়ের সুখকর পদ্য লিখেছে বাংলাদেশ। সুখের পদ্য লেখার নায়ক স্পিন চতুষ্টয়। ক্যারিবীয়দের দুই ইনিংসে ২০ উইকেট সবগুলোই ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন সাকিব, মিরাজ, তাইজুল ও নাঈম। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন মিরাজ। প্রথম ইনিংসে ৭টির পর দ্বিতীয় ইনিংসের শিকার ৫টি।

প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন :  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজে সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে হোয়াইটওয়াশের জন্য জাতীয় ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও ফাইনাল টেস্ট সিরিজে ক্যারিবিয়ানদের ইনিংস এবং ১৮৪ রানে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে টাইগারদের এটি বিশাল ব্যবধানের বিজয়। সিরিজের ফলাফল দাঁড়িয়েছে ২-০। এক অভিনন্দন বার্তায় ক্রিকেটপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ বিজয়ে সব খেলোয়াড়, কোচ, জাতীয় ক্রিকেট দলের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের খেলোয়াড়দের টিমস্পিরিট এবং তাদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে গোটা জাতি গর্বিত। শেখ হাসিনা বলেন, ক্রীড়ার প্রতি বর্তমান সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থনের কারণে এ সাফল্য এসেছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এ বিজয়ের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। ২৪ নভেম্বর জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬৪ রানে পরাজিত করে।

শেয়ার করুন:

Related posts